
মোঃমাহফুজুর রহমান মোর্শেদ
বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি:
নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণপরিবহন খাতে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) উদ্যোগে চালু হয়েছে বিশেষ ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ বা ‘পিংক বাস’। প্রাথমিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ার ১৩টি রুটে মোট ১৪টি বাস দিয়ে এ সেবা চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ১০টি, চট্টগ্রামে ২টি এবং বগুড়ায় ২টি বাস চলাচল করবে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিআরটিসির চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সরকারের এই উদ্যোগকে সাধারণ মানুষ সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, নারী যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াতের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত নারী চালক, কন্ডাক্টর ও পরিবহনকর্মীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
নারী বাসচালকদের বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তাঁদের আত্মবিশ্বাস, দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন ড্রাইভিং স্কুলে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। অন্যদের হাতে-কলমে গাড়ি চালানো শিখিয়েছেন এবং নিজেরাও সড়কে বাস্তব ড্রাইভিংয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। বড় বাস চালানোর জন্য তাঁরা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেছেন।
ফলে শুধু লাইসেন্স প্রদান করেই তাঁদের রাস্তায় নামানো হয়নি। প্রশিক্ষণ, দক্ষতা অর্জন, প্রস্তুতি ও বাস্তব অভিজ্ঞতার যথাযথ ধাপ অতিক্রমের পরই তাঁদের বড় বাস চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন
নারীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা শুধু একটি পরিবহন সেবা চালুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে রয়েছে নারীর কর্মসংস্থান, আত্মনির্ভরতা, নিরাপদ যাতায়াত এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির বৃহত্তর লক্ষ্য।
সরকারের ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে নারীদের কর্মসংস্থান ও নিরাপদ চলাচলের সুযোগ সম্প্রসারণের যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, বিশেষ নারী বাস সার্ভিসকে তার বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন সাধারণ মানুষ।
প্রাথমিকভাবে ১৪টি বাস দিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে বাসের সংখ্যা ও রুট বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিআরটিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী তিন মাসের মধ্যে ৫০টি বাস চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে দেশের অন্যান্য বিভাগেও নারী বাস সার্ভিস সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
নারীর হাতে স্টিয়ারিং নিয়ে মানুষের আগ্রহ-রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে নারী চালকদের বড় বাস পরিচালনার দৃশ্য ইতোমধ্যে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রশিক্ষিত নারী চালকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং নারী যাত্রীদের জন্য নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সাধারণ যাত্রীরা মনে করছেন, এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত ও পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে পরিবহন খাতে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি পাবে।
নারী চালকদের নিয়ে সামাজিকভাবে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা থাকলেও বাস্তবতা হলো—দুর্ঘটনা কোনো লিঙ্গ দেখে সংঘটিত হয় না।
পুরুষ চালকের দুর্ঘটনা হলে যেমন সেটিকে সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, নারী চালকের ক্ষেত্রেও একই দৃষ্টিভঙ্গি থাকা উচিত। একজন চালকের দক্ষতা মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাঁর প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা, দায়িত্বশীলতা এবং সড়ক নিরাপত্তা মেনে চলার সক্ষমতার ভিত্তিতে।
এক নারী বাসচালকের বক্তব্যের সারকথা—মানুষের মন্তব্যকে গুরুত্ব দিলে তিনি এতদিন ড্রাইভিং ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারতেন না, কিংবা বড় বাসের স্টিয়ারিং হাতে নিতে পারতেন না।
তাঁর এই আত্মবিশ্বাসই নতুন প্রজন্মের নারীদের জন্য একটি বার্তা—সুযোগ পেলে নারীও সক্ষম। দক্ষতা ও সাহস থাকলে নারী নিজের পথ নিজেই তৈরি করতে পারে।
আজ প্রথম, কাল স্বাভাবিক
আজ একজন নারী যখন বড় বাসের স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে ব্যস্ত সড়কে নামছেন, তখন তিনি শুধু একটি বাস পরিচালনা করছেন না; তিনি একটি প্রচলিত ধারণার বিপরীতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছেন।
হয়তো আজ তিনি প্রথম। কাল আর প্রথম থাকবেন না। একদিন নারী বাসচালকও গণপরিবহনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠবেন।
সেদিন কেউ অবাক হয়ে বলবে না—‘একজন নারী বাস চালাচ্ছেন। বরং বলবে—বাসটি একজন দক্ষ চালকই পরিচালনা করছেন।
নারীর হাতে স্টিয়ারিং তাই শুধু একটি বাস পরিচালনার ঘটনা নয়; এটি দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, কর্মসংস্থান, আত্মনির্ভরতা ও সমান সুযোগের পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার একটি নতুন অধ্যায়।